সুরবেক বিশ্বাসইলিয়ট পার্ক তৈরির কাজ তখন পুরোদমে। তার উত্তরে জওহরলাল নেহরু রোড থেকে ময়দানের দিকে সোজা যে রাস্তা ঢুকেছে, সেখানেই একটি ঝোপের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল মৃতদেহটি। তরুণী, বয়স তিরিশের এ দিক-ও দিক। গলায় ওড়নার ফাঁস।ময়দান মেট্রো স্টেশনের কুলিং প্লান্টের এক নিরাপত্তারক্ষী মৃতদেহটি দেখে পুলিশে খবর দেন। ২০০৪-এর ৩০ মে। রাত প্রায় ১১টা। সাদা চোখেই বোঝা গেল, শ্বাসরোধ করে খুন। পর দিন ময়নাতদন্ত করে অটোপসি সার্জেনও সেই মর্মে তাঁর অভিমত জানানোয় খুনের মামলা রুজু করা হল ময়দান থানায়।কিন্তু খুনি কে? তার চেয়েও এ ক্ষেত্রে বেশি জরুরি, নিহতই বা কে? সেটা না জানা গেলে তো খুনি পর্যন্ত পৌঁছোনো দুষ্কর। এবং নিহতের পরিচয় জানাও গেল না। ময়দান থানার সেই কেস নম্বর ৭৯ (তারিখ ৩১.০৫.২০০৪)-র ফাইল আস্তে আস্তে ধামাচাপা পড়ে গেল। কিন্তু বছর খানেক পর যা ঘটল, তা কেউ দৈব যোগ বলতেই পারেন। তবে পুলিশের কয়েক তাবড় কর্তা বলেন, নিষ্ঠা এবং স্মৃতিশক্তির ফল। কলকাতা পুলিশ তাদের প্রতিটি থানার নোটিস বোর্ডে সেই নিহত তরুণীর ছবি টাঙিয়ে রেখেছিল। তেমনই ছিল টালিগঞ্জ থানার নোটিস বোর্ডেও। দেখেছিলেন ওই থানায় সদ্য যোগ দেওয়া এক তরুণ সাব-ইনস্পেক্টর।কলকাতা পুলিশ তখন প্রতিটি এলাকায় বাড়ি বাড়ি, বিশেষ করে একা থাকা প্রবীণ নাগরিকদের বাড়ির পরিচারক-পরিচারিকাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে। তত দিনে পরিচারকদের হাতে পর পর কয়েকটি অপরাধও ঘটে গিয়েছে শহরে। এমনই এক রুটিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে টালিগঞ্জ থানার ওই অফিসার মনোহরপুকুর রোডের একটি বাড়িতে গেলে সেখানে একা থাকা এক বৃদ্ধা জানালেন, তাঁর সর্বক্ষণের এক পরিচারিকা বছরখানেক আগে হঠাৎ এক বিকেলে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেননি। সেই তরুণ অফিসারটি দ্রুত থানায় ফিরে নোটিস বোর্ড থেকে খুলে ছবিটা নিয়ে আবার গেলেন বৃদ্ধার বাড়িতে। দেখেই বৃদ্ধা তাঁর পরিচারিকা সবিতা রায়কে শনাক্ত করলেন।68448015 গা ঝাড়া দিয়ে নতুন উদ্যমে তদন্তে নামলেন গোয়েন্দারা। নিহতের শনাক্তকরণ হওয়ার পরেই রহস্যের জট একটা একটা করে খুলতে শুরু করল। তদন্তকারীরা জানতে পারলেন, মনোহরপুকুর রোডেরই বাসিন্দা এক ব্যক্তির গাড়ির চালক মহেশ মাহাতোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল সবিতার। মহেশ আদতে বিহারের বাসিন্দা। সবিতা যে বিকেল থেকে নিখোঁজ, ২০০৪-এর ৩০ মে, সেই বিকেলে মহেশের সঙ্গেই তাঁকে শেষ বার ওই পাড়ায় দেখা গিয়েছিল। তার পর থেকে মহেশও উধাও। যে রাতে সবিতার মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল।ঝোপের মধ্যে সবিতার মৃতদেহ পড়ে থাকার খবর যাঁর কাছ থেকে মিলেছিল, ময়দান মেট্রো স্টেশনের কুলিং প্লান্টের সেই নিরাপত্তারক্ষীকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন লালবাজারের গোয়েন্দারা। টানা জিজ্ঞাসাবাদের মুখে বছর কুড়ির ওই তরুণ যা বললেন, তাতে চমকে গেলেন দুঁদে অফিসাররাও। ওই তরুণ জানালেন, তাঁর নেশা হল, ময়দানের ঝোপেঝাড়ে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় থাকা যুগলকে আড়ালে থেকে লক্ষ করা। তাঁরা কী করছেন, সেটা তারিয়ে তারিয়ে দেখা। এবং সেই ভাবে ওই তরুণ সেই রাতে অন্য একটি ঝোপের আড়ালে থেকে সবিতা ও মহেশকেও ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখেছিলেন। ওই নিরাপত্তারক্ষীর কাছ থেকে পুলিশ জানতে পারল, সবিতা ও মহেশ ওই রাতে ঝোপের মধ্যে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হন। শেষ দিকে মহেশ হঠাৎ সবিতার ওড়না দিয়েই তাঁর গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলে। মেট্রোর ওই নিরাপত্তারক্ষী কিছুক্ষণ পর এক মহিলার দেহ পড়ে থাকার কথা তাঁর সহকর্মীদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু গোটা ঘটনাটি জানাননি। যাতে তাঁর ওই নেশার কথা চাপা থাকে। মহেশের ছবি দেখে তাঁকে খুনি হিসেবে শনাক্তও করলেন ওই তরুণ।মহেশের বাড়ি বিহারের মুজফ্ফরপুর জেলার কাঠিয়া এলাকার মানিকপুর গ্রামে। সেখানে কয়েক বার হানা দেয় কলকাতা পুলিশের দল। কিন্তু তাঁকে পাওয়া যায়নি। উল্টে অভিযোগ, মনোহরপুর রোডের সেই পুরোনো কাজের বাড়িতে একাধিক বার ফোন করে মহেশ হুমকি দেন, পুলিশকে তাঁর দেশের বাড়ির ঠিকানা জানিয়ে দেওয়ার ফল ভালো হবে না।তার পরেও মহেশের খোঁজে আরও কয়েক বার বিহারে গিয়েছিলেন গোয়েন্দারা। কাজের কাজ কিছু হয়নি। ২০০৬-এর মে মাসে সবিতা রায় হত্যা মামলার ফাইল বন্ধ করে দেওয়া হয়। বহু প্রশ্নের উত্তর অধরা রেখে। সবিতাকে মহেশ খুন করলেন কেন, মহেশকে কি ওই তরুণী বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছিলেন নাকি অন্য কোনও কারণ? এর সঠিক উত্তর এক জনেরই জানা ছিল। মহেশ মাহাতো।
from Eisamay https://ift.tt/2TFVueK
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
Author Details
I am an Executive Engineer at University of Barishal. I am also a professional web developer and Technical Support Engineer.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন