বরিশালের টাইমস, জাতীয়, রাজনীতি, অর্থনীতি, সারা বাংলা, আন্তর্জাতিক, খেলাধুলা, চাকরি, বিনোদন, সাতসতেরো, ক্যাম্পাস, অন্যান্য

Breaking

শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২০

রেকর্ডগড়া জন এডরিচের ট্রিপল সেঞ্চুরি কথন

রেকর্ডগড়া জন এডরিচের ট্রিপল সেঞ্চুরি কথন

বোরহান উদ্দীন জাবেদ

জন হিউ এডরিচ, এই নামটির সঙ্গে ক্রিকেট অনুরাগীদের প্রায় সবাই পরিচিত। যদিও আজকে তার ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণে না গিয়ে একটা ইনিংসে চোখ রাখার চেষ্টা করবো। যেহেতু ষাট-সত্তর দশকের ক্রিকেটার ছিলেন কিছু স্মৃতিচারণে যেতেই হয়।

ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের কথা পড়েছেন নিশ্চয়ই। তাহলে এতক্ষণে আপনার এও জানা হয়ে গেছে, ইতিহাসের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচের সৌভাগ্যবান বাইশ জনের একজন ছিলেন এই এডরিচ। পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা ঘামানোর অভ্যাস থাকলে এটাও নিশ্চয়ই জানেন, ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম চার, প্রথম ওয়ানডে অর্ধশতক এবং ওয়ানডেতে প্রথম ম্যান অফ দ্য ম্যাচের স্বীকৃতি কে পেয়েছিলেন? হ্যাঁ, জন হিউ এডরিচই। ১১৯ বলের সে ইনিংসে চারটি চারের সাহায্য ৮২ রান করে সে ম্যাচের সর্বোচ্চ স্কোরারও ছিলেন এডরিচ।

তার সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এডরিচকে। ৭৭ টেস্টে ৪৩.৫৪ গড়ে ১২ সেঞ্চুরিতে ৫১৩৮ রান সেই বিবেচনার পক্ষেই কথা বলে। এডরিচের জন্য ঘরের মাঠ আর প্রতিপক্ষের মাঠ বলে আলাদা কোন ব্যাপার ছিল না। দুই জায়গায়ই সমানতালে চলেছে তাঁর ব্যাট। ঘরের মাঠে এডরিচের ব্যাটিং গড় ৪৩.৮১। সেখানে ঘরের বাইরে ব্যাটিং গড় ৪৩.১০। এডরিচের ব্যাটের রোষানলে সবচেয়ে বেশী পড়েছে ইংলিশদের প্রবল প্রতিপক্ষ অজিরা। বারো টেস্ট সেঞ্চুরির আটটাই তাদের বিপক্ষে করেছেন এডরিচ।

অজি আর ইংলিশ ক্রিকেটার মানে অ্যাশেজ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেই। এডরিচ ই-বা বাদ যাবেন কেন? অজি-ইংলিশ দ্বৈরথের অ্যাশেজে এডরিচের ব্যাট কথা বলেছে নিয়মিতই। অ্যাশেজের অভিষেকে সেঞ্চুরিসহ করেছেন ২৬৪৪ রান। ব্যাটিং গড় ৪৮.৯৬। নিদিষ্ট করে অজিদের মাটিতে হিসেব করলে এই গড় আরো অবিশ্বাস্য। তাদের মাটিতে ৫৫.৭৮ গড়ে করেছেন ১২৮৩ রান।

আরেকটা তথ্য দিয়ে পরিচয় পর্বটা শেষ করতে চাচ্ছি। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে যে পঁচিশ জন ক্রিকেটার একশো সেঞ্চুরির বিরল রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন। জন হিউ এডরিচ তাঁদেরই একজন। ১৯৭৬ সালে ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে ম্যাচে ইতিহাসের সতেরোতম ক্রিকেটার হিসেবে একশো সেঞ্চুরির মাইলফলকে পোঁছান এডরিচ। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করেছেন ১০৩ টি। তাই এই তালিকায় এডরিচের অবস্থান যৌথভাবে একুশ নাম্বারে।

ক্রিকেটে রেকর্ড মানে নিত্যনতুন ভাঙ্গা গড়ার খেলা। আজকে যে রেকর্ডটা কেউ ছাপিয়ে যাওয়া অসম্ভব মনে করছেন আপনি, আগামীকাল সেটিই হয়তো নতুন সাজে, নতুন নামে হাজির হচ্ছে। আবার ব্রাডম্যানের ৯৯.৯৪ গড় কিংবা শচীন টেন্ডুলকারের একশো সেঞ্চুরির মতোই কিছু রেকর্ড এখনো অক্ষত আছে। তেমনই একটি রেকর্ড এডরিচের ‘সর্বোচ্চ বাউন্ডারির’ অপরাজিত ৩১০ রানের ইনিংসটি। ৫২ চার আর ৫ ছক্কায় এডরিচ সাজিয়েছিলেন সেই ইনিংসটি।

মূলত যেই কারণে এই ইনিংসটি নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি সেদিকে দৃষ্টিপাত করি। বায়ান্ন চার আর পাঁচ ছক্কার গুণফলে এডরিচ বাউন্ডারি থেকেই নিয়েছিলেন ২৩৮ রান। শতাংশের হিসেবে গেলে ৭৬.৭৭ শতাংশ রানই নিয়েছিলেন বাউন্ডারি থেকে। দুই ক্ষেত্রেই আজও এডরিচকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি কোন ব্যাটসম্যান। বাউন্ডারি থেকে ২১৮ রান করে কাছাকাছি অবস্থানে গিয়েছিল ম্যাথু হেইডেনের ৩৮০ রানের ইনিংসটি। তবে শতাংশের হিসেবে এডরিচের ৭৬.৭৭ থেকে পরিস্কার ব্যবধানে পিছিয়ে হেইডেনের ৫৭.৩৬ শতাংশ রান। শতাংশের হিসেবে হেইডেনের থেকে এগিয়ে থাকলেও বাউন্ডারি থেকে রানের হিসেবে ২০৬ রান নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইনজামাম উল হকের ৩২৯ রানের ইনিংসটি।

এডরিচের সেই ইনিংসের আলোচনায় মাঠের ক্রিকেটে চোখ ফেরানো যাক। ১৯৬৫ সালের সেই ম্যাচে হেডিংলিতে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড। প্রথম দুই ম্যাচে দলে ছিলেন না এডরিচ। এডরিচ দলে ছিলেন না দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে আগের সিরিজেও। তৃতীয় টেস্টে সেরা একাদশে জায়গা পান নিয়মিত ওপেনার জিওফ্রে বয়কটের জায়গায়।

টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন ইংলিশ অধিনায়ক মাইক স্মিথ। বব বারবারের নতুন ওপেনিং পার্টনার জন এডরিচ। দলীয় স্কোর ১৩ রানে পৌঁছতেই ব্রুস টেইলরের বলে আউট হয়ে সাজঘরে ফেরেন বব বারবার। রেকর্ডগড়া ইনিংসের পথে ফিল্ডারের বদান্যতায় দুইবার জীবন পান এডরিচ। প্রথমটা ব্যক্তিগত ৪০ রানে। কিন্তু সেটার মূল্য যে এভাবে চুকাতে হবে সেই মুহূর্তে একটু কি ভেবেছিলেন ফিল্ডার? হয়তো এডরিচ নিজেই ভাবেননি প্রাপ্ত সুযোগটা এভাবে কাজে লাগাতে পারবেন।

ভিক্টর পোলার্ডকে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় ছক্কা মেরে দেড়শো রানে পোঁছান এডরিচ। কয়েক বলের ব্যবধানে তৃতীয় ছক্কা মারেন একই বোলারকে। উইজডন এডরিচের তৃতীয় শটটাকে উল্লেখ করেছিল, ‘a mighty on-drive into the corner of the cricket-football stand’। প্রথম দিনের খেলা শেষে ইংল্যান্ডের রান ৩৬৬। উইকেট ওই একটিই। এডরিচ অপরাজিত আছেন দ্বিশতকের দ্বারপ্রান্তে, ১৯৪ রানে। এডরিচের কাউন্টি দল সারে সতীর্থ জন ব্যারিংটন অপরাজিত আছেন ১৫২ রানে।

দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু হতেই সাত সকালে ব্যারিংটন ব্যক্তিগত স্কোরে আর মাত্র ১১ রান যোগ করতেই ১৬৩ রানে আউট হয়ে যান। দ্বিতীয় উইকেটে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ রানের জুটি থেকে ১৩ রান দূরত্বে থেকে ৩৬৯ রানে দুজনের জুটির বন্ধন ছিন্ন হয়। এডরিচের রান তখন কাঁটায় কাঁটায় ১৯৯। ফিল্ডারের কল্যাণে দ্বিতীয়বার যখন জীবন পান। এডরিচ তখন অপরাজিত ২৮৭ রানে।

লং অফ দিয়ে দারুণ এক ড্রাইভে ইতিহাসের সপ্তম ব্যাটসম্যান হিসেবে ট্রিপল সেঞ্চুরির এলিট ক্লাবে যুক্ত হন জন হিউ এডরিচ। ট্রিপল সেঞ্চুরিটি একদমই উড়ে এসে জুড়ে বসা ধরনের ছিল না এডরিচের জন্য। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের আগের আটটি ইনিংসে চোখ বুলালে আপনিও একমত পোষণ করবেন। ১৩৯, ১২১, ২০৫, ৫৫, ৯৬, ১৮৮, ৯২, ১০৫ - এই সংখ্যাগুলো কেবলই গাণিতিক কোন সংখ্যার খেলা নয়। এগুলো কাউন্টি ক্রিকেটে মৌসুমের পর মৌসুম এডরিচের অবিশ্বাস্য ফর্মের নমুনামাত্র। এই ইনিংসটি ছিল সুযোগের সদ্ব্যবহারের অনন্য উদাহরণ। কাউন্টির ফর্মটা কোনভাবেই জাতীয় দলে নিয়ে আসতে পারছিলেন না এডরিচ। এজন্যই জাতীয় দলে ছিলেন অনিয়মিত। এই ইনিংসের মাধ্যমে জাতীয় দলে রানের রাস্তাটা কেবলই প্রশস্ত করেছিলেন এডরিচ।

দলীয় স্কোর ৫৪৬ রান। উইকেট পড়েছে সাকুল্যে চারটি। এডরিচের নামের পাশে অপরাজিত ৩১০ রান। এমন সময় আরো কিছু রেকর্ড হয়তো এডরিচকে বলছিল দ্রুতই ছাড়িয়ে যাও আমাদের! হাতছানি দিয়ে ডাকছিল তখনকার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ গ্যারি সোবার্সের ৩৬৫ রান। একেবারে নাকের ডগায় এসে উপস্থিত হওয়া বব সিম্পসনের ৩১১ রান। খানিক দূরে থাকা অ্যান্ডি স্যান্ডহামের ৩২৫ রান কিংবা ডোনাল্ড ব্রাডম্যানের ক্যারিয়ার সেরা ৩৩৪ রানের ইনিংসগুলো। কিন্তু ‘বেরসিক’ অধিনায়ক মাইক স্মিথ কিনা ইনিংস ঘোষণা করে দিলেন এডরিচকে কোন সুযোগ না দিয়েই। কেনো বেরসিক বলছি বুঝতে পারবেন একটু পরেই।

দুই ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের স্কোরকার্ডের দিকে চোখ রাখুন। এডরিচের সাথে আপনিও আক্ষেপ করে বলবেন - আর কিছুক্ষণ সময় দিলেই পারতো অধিনায়ক মাইক স্মিথ। দুই ইনিংসে ব্ল্যাক ক্যাপসরা করতে পেরেছিল মোটে ৩৫৯ রান। এডরিচের ইনিংসের থেকে মাত্র ৪৯ রান বেশি। খেলা শেষ চতুর্থ দিনেই। ম্যাচ হেরে ৩-০ তে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল ব্ল্যাক ক্যাপসরা।

 

ঢাকা/কামরুল



from Risingbd Bangla News https://ift.tt/32wnViC

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Pages