
আহ্ বর্ণবাদ
আমিনুল ইসলাম নাবিলকালো চামড়ার মানুষের প্রতি সাদা চামড়ার মানুষের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যই মূলত বর্ণবাদ। বর্ণবাদ কখনো গায়ের চামড়ার রঙ দিয়ে হতে পারে, কখনোবা আঞ্চলিকতা, পেশা এবং গোত্র দিয়েও হতে পারে।
এইতো কদিন আগের ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশের নির্যাতনে প্রাণ হারান কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড। যা গোটা বিশ্বে আলোড়ন তোলে। ‘BlackLivesMatter’ (কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনও মূল্যবান) নামের আন্দোলনও গড়ে ওঠে। ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিং-এর মৃত্যুর পর এটিই আমেরিকাতে সংঘটিত হওয়া সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।
জরিপে দেখা গেছে, ২০১৯ সালে আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। ম্যাপিং পুলিশ ভায়োলেন্স নামে একটি বেসরকারি সংস্থার চালানো জরিপে দাবি করা হয়েছে, আমেরিকায় পুলিশের গুলিতে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গরা তিনগুণ বেশি মারা যায়।
বর্ণবাদের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত নয় ক্রীড়াঙ্গনও। ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। ফুটবলের সর্বোচ্চ দুই সংস্থা ফিফা ও উয়েফা ‘সে নো টু রেসিজম’ নামের ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেও বর্ণবাদকে ঠেকাতে পারছে না। ক্রিকেটেও বর্ণবাদ অপরিচিত নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার অ্যান্ডেল ফেলুকায়োকে কালো বলে সম্বোধন করে সমালোচিত হয়েছিলেন পাক অধিনায়ক সারফারাজ। বর্ণবাদ নিয়ে মুখ খুলেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দুবার বিশ্বকাপ জেতানো ড্যারেন স্যামি। আইপিএলে খেলার সময় তাকে কালু নামে ডাকা হতো। এছাড়া বর্ণবাদের শিকার হয়ে অলিম্পিক স্বর্ণপদক ওহাইয়ো নদীতে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন বক্সার মোহাম্মদ আলী।
বর্ণবাদ যেন আজ আমাদের প্রতিটি অন্তরে প্রবেশ করেছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্ণবাদ। সভ্যতার এই সময়েও সমাজে অনেকেই বিভিন্নভাবে বর্ণবাদের শিকার হচ্ছেন। কালো বলে অনেক মেয়েরই বিয়ের আগে কটুকথা শুনতে হয়। তাইতো তাদের মধ্যে চলে ফর্সা হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ২০১৭ সালে সারা বিশ্বে গায়ের রং ফর্সা করার বাজারের আকার ছিল প্রায় ৪৮০ কোটি ডলার।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে এই বাজার ৮৯০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে। এসব পণ্য ব্যবহারে ত্বকে ফুসকুড়ি হওয়া, কালশিটে দাগ পড়া ইত্যাদি নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। এমনকি এসব পণ্যে থাকা মার্কারির কারণে কিডনির ক্ষতি পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক হিসেবে দেখা গেছে, আফ্রিকাতে প্রতি ১০ জন নারীর চারজন রং ফর্সাকারী পণ্য ব্যবহার করে থাকেন।
আফ্রিকায় বর্ণবাদের শুরুটা হয়েছিল প্রায় সাড়ে তিনশ’ বছর আগে। এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সারাজীবন কতইনা সংগ্রাম করে গেছেন কিংবদন্তী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। বোর্ডিং স্কুল শেষ করার পর তরুণ ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ফোর্ট হেয়ারে ভর্তি হয়েছিলেন। কর্তৃপক্ষের বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে সেখানে তিনি বিদ্রোহ করেন। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কাজ করায় তাকে দীর্ঘ ২৭টি বছর কাটাতে হয়েছে কারাগারে। ১৯৬২ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। এমনকি কারাগারেও করা হত বর্ণবাদী আচরণ। কৃষ্ণাঙ্গ বন্দিদের দেওয়া হতো সবচেয়ে কম খাবার। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। দমে যাননি। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আপোষহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।
দীর্ঘ কারাভোগ শেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি কারামুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে অর্জন করেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। ১৯৯৪ সালে হন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট। সারাজীবন এত নিপীড়ন সয়েও ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সাদা চামড়ার মানুষদের ওপর কোনো প্রতিহিংসাপরায়ণ আচরণ করেননি। তার এই মহানুভবতা তাকে বিশ্ব নেতায় পরিণত করেছে।
আজ ১৮ই জুলাই। ১৯১৮ সালের আজকের এই দিনে থেম্বু রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ম্যান্ডেলা। জন্মদিনে এই নেতার প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। পৃথিবী থেকে বর্ণবাদের মূলোৎপাটন করতে পারলেই ম্যান্ডেলার আন্দোলন সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে।
ঢাকা/ মাহফুজ/মাহি
from Risingbd Bangla News https://ift.tt/2BaoB1P
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন