অনির্বাণ ঘোষ ও মৈত্রেয়ী ভট্টাচার্যহাতে গোঁজা স্যালাইনের নল। রোগীর নয়, খোদ চিকিৎসকের। সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ। রোগীর ভিড় উপচে পড়ছে। রোগী দেখছেন এক মহিলা চিকিৎসক। গলায় স্টেথো, হাতে গোঁজা স্যালাইনের নল।রাজ্যের এক সরকারি হাসপাতালের এমন ছবিই ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙড়-২ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক রূপ চক্রবর্তী, হাসপাতালে রোগী দেখার ছবি পোস্ট করেন ফেসবুকে। যেখানে তিনি যুগপৎ চিকিৎসারত এবং চিকিৎসাধীন। রোগীর প্রতি চিকিৎসদের ঔদাসীন্য নিয়ে প্রায়শই শোরগোল তোলা মানুষদের প্রত্যুত্তর যেন দিচ্ছে দায়িত্বশীলতার এই ছবি।বৃহস্পতিবার রাত ১১:১৪ মিনিটে ভাঙড়-২ বিপিএইচসি-র এই মেডিক্যাল অফিসার রূপ চক্রবর্তীর করা ওই ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, আগের দিন অর্থাৎ বুধবার থেকেই তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু দুই সহকর্মী অসুস্থ। তাই ১৪ তারিখের ২৪ ঘণ্টার ডিউটি করার দায়িত্ব পড়ে তাঁর উপরেই। পেনকিলার খেয়ে বহির্বিভাগে রোগী দেখতে বসলে শুরু হয় বমি। ৬-৭বার বমির পর শরীরে জলের টান পড়ছে (ডিহাইড্রেশন) বুঝতে পারেন চিকিৎসক। এ দিকে সামনে তখন অপেক্ষারত কয়েকশো রোগী। বাধ্য হয়েই হাসপাতালের কর্মীদের নির্দেশ দেন হাতে স্যালাইন চালু করার। অন্য হাতে একের পর এক প্রেসক্রিপশন লিখতে থাকেন রূপ।বহির্বিভাগের প্রায় ৮০০ রোগী দেখা শেষ হলে শুরু হয় জরুরি বিভাগ সামলানোর কাজ। সন্ধ্যার পর রূপের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালের কর্মীরাই খবর দেন ছুটিতে থাকা অন্য চিকিৎসককে। ঘণ্টা তিনেক পর, সেই চিকিৎসক এলে ডিউটি থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিজের চিকিৎসার দিকে নজর দেন রূপ। আপাতত, শহরের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। পেটে ব্যথার সঙ্গে রয়েছে ধুম জ্বর। কেন এই ফেসবুক পোস্ট? নিজের পোস্টেই রূপ সে প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলেছেন, 'আমি কোনও সহমর্মিতা আদায়ের জন্য এই পোস্টটা করছি না। আমি শুধু মানুষকে জানাতে চাই, একজন চিকিৎসক কী ভাবে নিজের শারীরিক, মানসিক স্বাস্থের কথা বিন্দুমাত্র না-ভেবে তাঁর রোগীকে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে যান।' রূপের এই ফেসবুক পোস্ট মনে করিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসক বিভাস খুটিয়ার কথা। পতন্দা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এই সরকারি চিকিৎসক গত ১৬ জানুয়ারি, এক মহিলার ডেলিভারি করানোর পর লেবার রুমেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। নিজের ফেসবুক ওয়াল ছাড়া চিকিৎসক ফোরামের ক্লোজড গ্রুপে করা রূপের এই পোস্ট ভূয়শী প্রশংসার পাশাপাশি ডেকে এনেছে অন্য বিপদও। ইতিমধ্যেই তাঁকে শো-কজ করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি অর্জুন দাশগুপ্তর কথায়, 'রাজ্যের সরকারি পরিকাঠামোর যা হাল, তা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন ওই চিকিৎসক। সেই কারণেই তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থাতেই শো-কজ পাঠানো হয়েছে।' শোকজের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন রূপও। তিনি বলেন, '১৪ তারিখ অন কল ডিউটির সন্ধ্যা থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত অনুপস্থিত থাকার জন্য আমাকে কারণ দর্শাতে বলেছেন ব্লক-স্বাস্থ্য আধিকারিক। অথচ, আমার শারীরিক অবস্থা এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকার বিষয়টি নথি-সহ পাঠানো রয়েছে ঊর্ধ্বতনকে।' চিকিৎসকদের একাংশের অবশ্য মত, বারাসত জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক অরুণাচল দত্ত চৌধুরীর মতোই, স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত হাল প্রকাশ্যে নিয়ে আসার কারণেই শো-কজের খাঁড়া এসেছে পড়েছে রূপের উপরও। প্রসঙ্গত, অরুণাচল সাসপেন্ড হয়ে আছেন এখনও। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলেন, 'নিজের কথা না-ভেবে পরিষেবা দেওয়াটাই চিকিৎসকের কাজ। সেটা ফেসবুকে দিয়ে প্রচার করাটা অনুচিত। তবে এ ক্ষেত্রে কী হয়েছিল খবর নিয়ে দেখতে হবে।'
from Eisamay https://ift.tt/2TG3qwI
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
Author Details
I am an Executive Engineer at University of Barishal. I am also a professional web developer and Technical Support Engineer.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন