সঞ্জয় চক্রবর্তী ■ নকশালবাড়িভোট আসে ভোট যায়। অথচ, ওঁরা পড়ে থাকে সেই অন্ধকারে। এই সময়ে মাত্র কয়েক মাস একটু গুরুত্ব বাড়ে। আবার ভোট ফুরিয়ে গেলে সবাই ভুলে যায় তাঁদের কথা। শিলিগুড়ি শহর থেকে মেরেকেটে ২৫ কিলোমিটার দূরে নকশালবাড়ির নানা গ্রামে টিকে রয়েছে এক জনপদ। কিন্তু ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতির বিচারে সহস্র যোজন দূরে পড়ে রয়েছেন তরাইয়ের জনজাতি ধিমালেরা। পুলিশ, আদালত কিংবা গ্রাম পঞ্চায়েত নয়, নিজেদের সমস্যার সমাধান নিজেরাই করেন তাঁরা। বিচার করার জন্য ধিমালদের নিজস্ব প্রধান বা মাঝি রয়েছে। তাঁদের জনজাতিদের মধ্যে কে, কোথায় কী নিয়মভঙ্গ করছে, তার খবর মাঝির কানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘লানডা’ রয়েছেন। সমাজের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত হলে বিচার করার জন্য মাঝির নেতৃত্বে পঞ্চ রয়েছেন। জনজাতির কেউ মরে গেলে স্বর্গে যাবেন নাকি নরকে, তা-ও ঠিক করে ওই পঞ্চ।রাজ্যের সরকার উত্তরবঙ্গের জনজাতিদের একের পর এক উন্নয়ন বোর্ড গড়ে দিয়েছে। অথচ তাঁদের কথা কেন ভাবা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তুলছেন তরাইয়ের প্রাচীন জনজাতি ধিমালেরা। সূত্রের খবর, ধিমালদের মধ্যে ভোটাধিকার রয়েছে প্রায় ৩০০ জনের। আর এই ভোটের জন্য ফের কয়েকদিন বাইরের লোকেদের আনাগোনা বেড়ে যাবে গ্রামগুলিতে।নকশালবাড়ির কেতুগাবুর, নেহালজোত, সুরজবর, কিলারাম, বুড়াগঞ্জ, হাতিঘিষার মইলি, নন্দলাল সাদা মল্লিক, হোসেন মল্লিকের মতো গ্রাম মিলিয়ে ধিমালদের সংখ্যা বড়জোর হাজার দেড়েকের মতো। জনজাতিতে সব মিলিয়ে স্নাতক মাত্র চার জন। স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন মাত্র একজন। তিনিও জীবিকার খোঁজে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছেন। বাকি জনসংখ্যার সামান্য অংশই মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছেন। ধিমাল জনজাতির প্রমুখ পানিঘাটা হাই স্কুলের শিক্ষক গর্জন মল্লিকের যুক্তি, ‘উন্নয়ন বোর্ড পেলে আমরা নিজেদের জনজাতির জন্য কিছু তো কাজ করতে পারতাম।’রাজ্য সরকার পাহাড়ের দশটি জনজাতির সঙ্গে ধিমালদেরও জুড়ে দিয়ে দিল্লিতে আবেদন জানিয়েছে ‘আদিবাসী’ মর্যাদা দেওয়ার জন্য। রাজনৈতিক টানাপোড়েনে সেই মর্যাদা পাওয়া যে সহজ নয় তা বেশ বুঝতে পারছেন ধিমালেরা। সেটা নিয়েও জনজাতির মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। পাহাড়ের অন্যান্য জনজাতিদের সঙ্গে তাঁদের জুড়ে দেওয়া হল কেন, এই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। গর্জনবাবু বলেছেন, ‘আমরা তো তরাইয়ের মানুষ। মহানন্দা থেকে নেপালের কঙ্কাই নদী পর্যন্ত আমাদের বসবাসের এলাকা। এখন যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে পাহাড়ের দশটি জনজাতির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আমাদের ভাগ্য।’অথচ সামাজিক রীতিনীতি থেকে সংস্কৃতি, সব দিক থেকেই ধিমালেরা আলাদা। এমনকী, অনেকে মেচ, রাভা, বোরোদের সঙ্গে তাঁদের জুড়ে দিলেও ধিমালদের দাবি, একমাত্র পাহাড়ের লিম্বুদের সঙ্গেই তাঁদের কিছুটা মিল রয়েছে। আদতে জুম চাষ ও শিকার-নির্ভর এই জনজাতির দাবি, ব্রিটিশদের উত্তরবঙ্গে আগমনের পর থেকেই দুর্ভাগ্য নেমে এসেছে তাঁদের কপালে। ব্রিটিশরা এই এলাকায় জমি রেকর্ড করা শুরু করলে ধিমালদেরও নেপাল লাগোয়া মেচির নদীর চরে বসবাসের জায়গা খুঁজে নিতে হয়। কিন্তু নিজেদের ভাষা এবং সংস্কৃতি এখনও আঁকড়ে ধরে রয়েছেন প্রায় বিলুপ্ত এই জনজাতি। পাশিংডো (দোতারা), তুলজাই (ঢোল), উড়নি, টুমনা, মরচুঙ্গা গোমনার মতো বাঁশ দিয়ে তৈরি অদ্ভুত রকমের যন্ত্রপাতি দিয়ে আজও তাঁরা পয়াপোকা (মাছ ধরার নৃত্য), লেইয়াদা (শিকার নৃত্য), ‘ডেরাদির’কে (গ্রাম পুজো) বাঁচিয়ে রেখেছেন। রাজ্য সরকার লোকশিল্পীদের প্রতি মাসে ভাতা দিলেও ধিমাল শিল্পীরা কেউ সরকারি ভাতাও পান না। বরং মদ শেষ করে দিচ্ছে ধিমাল প্রজন্মকে। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমালয়ান স্টাডিজের প্রাক্তন প্রধান অধ্যাপক বাণীপ্রসন্ন মিশ্র মনে করেন, ‘ধিমাল জনজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ দরকার।
from Eisamay https://ift.tt/2FwGoQ9
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
Author Details
I am an Executive Engineer at University of Barishal. I am also a professional web developer and Technical Support Engineer.
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন